বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর ও কৌশলগত দিক হলো অভিন্ন নদীর পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা। ১৯৯৬ সালের ১২ই ডিসেম্বর দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ১২ই ডিসেম্বর ২০২৬ তারিখে শেষ হতে যাচ্ছে। ফলে, এই চুক্তি নবায়ন কিংবা একটি নতুন বাস্তবসম্মত চুক্তিতে পৌঁছানো এখন ঢাকার জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক অগ্রাধিকার ও চ্যালেঞ্জ।
দীর্ঘ তিন দশক ধরে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তিটি দুই দেশের অববাহিকা অঞ্চলের মানুষের পানির চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখলেও, শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ প্রায়শই চুক্তির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের মত রয়েছে। ফারাক্কা বাঁধের কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ২০২৬ সালের পরিবর্তিত বৈশ্বিক জলবায়ু পরিস্থিতি, অতিবৃষ্টি ও অনাবৃষ্টির খামখেয়ালিপনা, নদীভাঙন, উজানে পানি প্রত্যাহার এবং অববাহিকার জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে পানির সামগ্রিক চাহিদা এখন অনেক গুণ বেশি। ফলে, হুবহু পুরোনো চুক্তি নবায়ন না করে সময়ের চাহিদাকে ধারণ করতে পারে এমন নতুন ধারা যুক্ত করা জরুরি।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে গঙ্গার পানি চুক্তি নবায়নে বাংলাদেশের কূটনীতিকে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও বিজ্ঞানভিত্তিক হতে হবে。 ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি জানিয়েছে, এই চুক্তি সংক্রান্ত বিষয়গুলো দ্বিপাক্ষিক যৌথ নদী কমিশনের (JRC) কাঠামোর আওতায় আলোচনা করা হবে। এই সুযোগে বাংলাদেশকে কেবল শুষ্ক মৌসুমের পানি বণ্টনেই সীমাবদ্ধ না থেকে নদীর তলদেশ ভরাট হওয়া রোধ (ড্রেজিং), অববাহিকাভিত্তিক সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে চুক্তির শর্তে অন্তর্ভুক্ত করার জোরালো দাবি তুলতে হবে।
একই সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থান এবং তিস্তাসহ অন্যান্য অভিন্ন নদীর অমীমাংসিত হিস্যাকেও এই জল-কূটনীতির সমীকরণে বিবেচনায় রাখতে হবে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক নদীর অধিকার নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক জলপ্রবাহ কনভেনশনের মূলনীতিগুলোকে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা যেতে পারে।
ডিসেম্বরের মধ্যে এই চুক্তি নবায়ন বা হালনাগাদ করা না গেলে শুষ্ক মৌসুমে নদীমাতৃক বাংলাদেশের কৃষি ও পরিবেশ বড় সংকটে পড়তে পারে। তাই গঙ্গা চুক্তি নবায়নের টেবিলটি ঢাকা-দিল্লির জন্য কেবল পানি ভাগাভাগির নয়, বরং সমতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক কূটনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার একটি বড় পরীক্ষা