কক্সবাজার ও ভাসানচরের শরণার্থী শিবিরগুলোতে প্রায় এক দশকের কাছাকাছি সময় ধরে ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছে। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া এই মানবিক সংকট বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি মানবিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি গভীর অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং জাতীয় নিরাপত্তা হুমকিতে পরিণত হয়েছে। ইউক্রেন ও গাজা সংকটের মতো বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্ব সম্প্রদায়ের মনোযোগ ও তহবিল দিন দিন কমছে। ফলে বিশাল এই জনসংখ্যার ভরণপোষণের চাপ এককভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর এসে পড়ছে। একই সাথে উখিয়া-টেকনাফের বনাঞ্চল ধ্বংস, মাদক চোরাচালান, অস্ত্র ও মানব পাচার এবং ক্যাম্পগুলোর অভ্যন্তরীণ সহিংসতা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে。
মিয়ানমারের বর্তমান অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ এবং জান্তা সরকারের অস্থিতিশীলতার কারণে অদূর ভবিষ্যতে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে。 এই বাস্তবতায় বাংলাদেশকে একটি সুনির্দিষ্ট এবং বহুমাত্রিক ‘দীর্ঘমেয়াদী কৌশল’ গ্রহণ করতে হবে:
  • আঞ্চলিক ও বহুমাত্রিক কূটনীতি (Multilateral Diplomacy): প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে সফল করতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বজায় রাখতে হবে। বিশেষ করে চীন, ভারত ও আসিয়ানের (ASEAN) মতো আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোকে এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে সরাসরি যুক্ত করার কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা জরুরি।
  • ট্রাক-টু ডিপ্লোম্যাসি ও অ-রাষ্ট্রীয় পক্ষ: মিয়ানমারের ভেতরে ক্ষমতার সমীকরণ দ্রুত পাল্টাচ্ছে। জান্তা সরকারের পাশাপাশি রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া আরাকান আর্মি (AA) এবং নির্বাসিত জাতীয় ঐক্য সরকার (NUG)-এর সাথেও কৌশলগত যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে।
  • স্মার্ট বর্ডার ও ক্যাম্প ম্যানেজমেন্ট: সীমান্ত নিরাপত্তা কঠোর করার পাশাপাশি শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং সিসিটিভি নজরদারি বাড়াতে হবে। মাদক ও অপরাধচক্রের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে বিশেষায়িত অভিযান চলমান রাখতে হবে।
  • আত্মনির্ভরশীলতা ও শিক্ষা: আন্তর্জাতিক সাহায্য কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাংক ও ইউএনএইচসিআর-এর সহায়তায় রোহিঙ্গাদের কারিগরি শিক্ষা ও ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে, যেন তারা ভবিষ্যতে রাখাইনে ফিরে নিজেদের সমাজ পুনর্গঠন করতে পারে।
রোহিঙ্গা সংকটের কোনো জাদুকরী বা তাৎক্ষণিক সমাধান নেই। বাংলাদেশ অনির্দিষ্টকালের জন্য এই বোঝা বহন করতে পারে না। তাই একটি টেকসই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কৌশলের মাধ্যমেই কেবল এই ভূরাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব।